‘পট’ বলতে কী বোঝানো হয়? এই শিল্পধারাটির একটি পরিচয়মূলক বিবৃতি প্রস্তুত করো।
(উত্তর) বাংলার লোকশিল্প পট : ‘পট’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ ‘চিত্র’। কাগজ আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত পট হিসেবে কাপড়ই ব্যবহৃত হত। পট, তা কাপড় বা কাগজ যাই হোক না কেন, তার উপর অঙ্কিত চিত্রই পটচিত্র।
পটের ইতিহাস : দ্বাদশ ও ত্রয়োদশ শতকে বাংলায় পটশিল্প প্রসার লাভ করলেও, পটের আবির্ভাব আরও আগে। সপ্তম শতকে রচিত ‘হর্ষচরিতে’ পটশিল্পী ‘পটুয়া’দের কথা আছে। বৌদ্ধভিক্ষুরা বুদ্ধের জীবনী বা জাতকের কাহিনি পটের মাধ্যমে প্রদর্শন করতেন। এতেই বোঝা যায় পটের প্রাচীনতা বিষয়ে।
ষোড়শ শতকে চৈতন্যদেবের বাণী প্রচারেও পটের ব্যাবহার লক্ষ করা যায়। মুকুন্দরামের ‘চণ্ডীমঙ্গল’ কাব্যে পটের উল্লেখ রয়েছে। অনুমিত হয়, প্রায় এক হাজার বছর আগে থেকেই উনবিংশ শতক পর্যন্ত পটুয়ারা সক্রিয় ছিলেন।
উপকরণ : পট তৈরি হত কাপড়ের উপর আঠামিশ্রিত কাদাগোলা কিংবা গোবরমিশ্রিত কাদাগোলা লেপনের মাধ্যমে, তারপর সেটি শুকিয়ে গেলে তাতে খড়িমাটি লেপন করা হত। চিত্রাঙ্কনের উপযুক্ত করে রং দিয়ে এর উপর কাজ করা হয়। পটশিল্পীরা পটুয়া, চিত্রকর প্রভৃতি নামে লোকসমাজে পরিচিত। লোকসংস্কৃতির এই বিশেষ ধারাটি ধর্মনিরপেক্ষ এক সংস্কৃতিবোধের পরিচয় প্রদান করে।
পটশিল্পের ধারা : পটুয়ারা যে পটচিত্র নির্মাণ করতেন তাতে উপস্থাপিত হয় লোককাহিনি কিংবা পুরাণাশ্রিত কাহিনি। বেদে সম্প্রদায়ের লোকেরা পটশিল্পের ধারা গ্রামে গ্রামে ঘুরে গান গেয়ে বর্ণনা করত। ধর্মীয়, সামাজিক অনুষ্ঠানের বিনোদন ছিল এই ‘পটের গান’। গায়েনরা গাইতেন চণ্ডীলীলা, রামায়ণ, মহাভারত, সত্যপীর, গাজীর পট ইত্যাদি বিষয় অবলম্বন করে। ভারতের বহুস্থানে এই পটচিত্রের অস্তিত্ব থাকলেও অবিভক্ত বাংলায় এর যে নিজস্ব শিল্পসুষমা তা অন্যত্র ছিল না। পূর্ববঙ্গের গাজীর পট ও সত্যপীরের পট, এপার বাংলার কালীঘাটের পট প্রভৃতি বিশেষ উল্লেখযোগ্য।
কালীঘাটের পট : কালীঘাটের পট উনিশ শতকের সর্বাধিক প্রসিদ্ধি লাভ করে। এতটাই জনপ্রিয় ছিল যে, প্যারিসেও এই পট বিক্রি হত। বিখ্যাত চিত্রশিল্পী পিকাসোর চিত্রশিল্পেও এর প্রভাব লক্ষ করা যায়। কালীঘাটের পটের বিশেষত্ব ছিল এই যে, এতে প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের চিত্রশৈলী মিশেছিল।
