[৮] ধর্মসংস্কার ও জাতীয়তাবাদের প্রসারে স্বামী বিবেকানন্দ ও রামকৃর মিশনের ভূমিকা আলোচনা করো।

[উ]

সূচনা—দেশপ্রেম ও আত্মবিশ্বাসের মূর্ত প্রতীক ছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৬৩-১৯০২ খ্রি.)। তাঁর জীবন ও বাণী বিদেশি শাসনে নির্যাতিত ভারতবাসীকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে নতুন শক্তিতে উজ্জীবিত করে তোলে। বিবেকানন্দ ধর্মকে সমাজের দুর্দশার সঙ্গে একাত্ম করে দেখেছিলেন। তাঁর মতে, “যে ধর্ম পিতৃমাতৃহীন অনাথের মুখে এক টুকরো রুটি তুলে দিতে পারে না সে ধর্মে আমি বিশ্বাস করি না।”

(১) নতুন ভারতের দূত

শ্রীরামকৃষ্ণের সুযোগ্য উত্তরসূরি স্বামী বিবেকানন্দ এক নতুন ভারতের স্বপ্ন দেখেছিলেন।

(১.ক) দেশপ্রেম ও জাতীয়তাবাদ : সন্ন্যাসী বিবেকানন্দ ভারতবাসীকে মানবপ্রেম ও স্বদেশপ্রেমের আদর্শে দীক্ষিত করে বলেন যে, “আত্মবিশ্বাসহীন মানুষই নাস্তিক এবং মানুষকে পাপী বলা পাপ”। তিনি যুবকদের উদ্দেশ্যে আহ্বান জানান, “বল ভাই—ভারতের মৃত্তিকা আমার স্বার্থ, ভারতের কল্যাণ আমার কল্যাণ।”

(২.খ) মানবধর্ম : বিবেকানন্দ ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে শিকাগোর বিশ্বধর্ম সম্মেলনে হিন্দুধর্মের অদ্বৈত বেদান্তবাদের জয় ঘোষণা করেন। বিবেকানন্দের ধর্ম হল ‘মানুষ তৈরির ধর্ম’।

(৩.গ) দুর্দশা ও অনাচারের বিরোধিতা : বিবেকানন্দ ভারতের দারিদ্র্য, অস্পৃশ্যতা, অশিক্ষা, দাসত্ব, জাতিভেদ, নারী-নির্যাতন প্রভৃতি দুর্দশা ও অনাচারের বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন। বিভিন্ন স্থানে পরিভ্রমণ করে তিনি এবিষয়ে প্রচার চালান।

(১.ঘ) পিছিয়ে পড়া মানুষদের জন্য চিন্তা : তিনি উপলব্ধি করেন যে, দেশের প্রকৃত শক্তি হল সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। তিনি মনে করতেন যে, নীচজাতির উন্নতির মাধ্যমেই একদিন নতুন ভারত গড়ে উঠবে। বিবেকানন্দ জীবনের শেষপ্রান্তে উপনীত হয়ে তাঁর প্রিয়জন ও শিষ্যদের উপদেশ দিয়ে যান, “দরিদ্র, নিরক্ষর, অজ্ঞান, দুঃখপীড়িত, এরাই তোমার ঈশ্বর। মনে রেখো এদের সেবাই শ্রেষ্ঠ ধর্ম।”

(২) জাতীয়তার অগ্রদূত

স্বামীজি ভারতের রাজনৈতিক স্বাধীনতার একজন উগ্র সমর্থক ছিলেন। তিনি প্রকাশ্য রাজনীতিতে অংশ নেননি—যদিও তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতা ও চিঠিপত্রে তাঁর উগ্র রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রকাশ পেয়েছে। স্বাধীনতা আন্দোলনের দিনগুলিতে স্বামীজি ছিলেন দেশপ্রেমিকের কাছে আদর্শস্বরূপ। তাঁর রচিত ‘জ্ঞানযোগ’, ‘রাজযোগ, ‘পরিব্রাজক’, ‘বর্তমান ভারত’ প্রভৃতি গ্রন্থ এবং তাঁর ‘পত্রাবলী’ ছিল বিপ্লবীদের নিত্যসঙ্গী। ঐতিহাসিকের মতে তিনি ‘আধুনিক ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জনক’ ।

(৩) রামকৃষ্ণ মিশন

শ্রীরামকৃষ্ণের ‘শিবজ্ঞানে জীবসেবা’র আদর্শকে বাস্তব রূপ দেওয়ার উদ্দেশ্যে স্বামী বিবেকানন্দ ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দের ১ মে ‘রামকৃষ্ণ মিশন’ প্রতিষ্ঠা করেন। মিশনের লক্ষ্য ছিল—

(৩.ক) রামকৃষ্ণের আদর্শ প্রচার : মানবের মঙ্গলে শ্রীরামকৃষ্ণ যেসব তত্ত্ব ব্যাখ্যা করেছেন বা নিজ জীবনে প্রয়োগ করেছেন সেগুলি জনসাধারণের মধ্যে প্রচার করা।

(৩.খ) সামাজিক কাজ : ‘মানুষ’ তৈরি, শিক্ষাবিস্তার, সমাজসেবা এবং জাতিগঠনের লক্ষ্যেই এই মিশন নিরন্তন গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে চলেছে। স্কুলকলেজ ও পাঠাগার নির্মাণ, অনাথাশ্রম প্রতিষ্ঠা, হাসপাতাল পরিচালনা, দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের উন্নয়ন এবং বন্যা, খরা ও দুর্ভিক্ষে নিপীড়িত মানুষের সেবায় মিশনের সন্ন্যাসীরা নিবেদিতপ্রাণ। ভারতে এবং ভারতের বাইরে মিশনের বহু শাখা ছড়িয়ে রয়েছে।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা
error: সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত