[মান—৮] বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি সম্বন্ধে আলোচনা করো। [অথবা] বাংলার নবজাগরণ বিষয়ে বিতর্ক এবং ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে এর তফাৎ আলোচনা করো।

[উ] উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণকে কেউ কেউ ১৫শ-১৬শ শতকের ইতালীয় নবজাগরণের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। আবার বাংলার নবজাগরণের প্রকৃতি, সীমাবদ্ধতা, গুরুত্ব প্রভৃতি বিষয়েও পণ্ডিতদের মধ্যে যথেষ্ট বিতর্ক রয়েছে।

(১) ‘নবজাগরণ’ অভিধা নিয়ে বিতর্ক

উনিশ শতকে বাংলার জাগরণকে ‘নবজাগরণ’ বলা যায় কি না তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। যথা—

(১.ক) বাস্তব নবজাগরণ—উনিশ শতকে বাংলায় প্রকৃতই নবজাগরণ ঘটেছিল বলে অনেকে মনে করেন। স্যার যদুনাথ সরকার তাঁর ‘History of Bengal’ গ্রন্থে ‘নবজাগরণ’ বলে অভিহিত করেছেন। অধ্যাপক সুশোভন সরকার, অম্লান দত্ত প্রমুখ বাংলার জাগরণকে ‘নবজাগরণ’ বলে মেনে নিয়েছেন।

(১.খ) তথাকথিত নবজাগরণ—অশোক মিত্র ১৯৫১ খ্রিস্টাব্দের আদমশুমারি রিপোর্টে বাংলার এই জাগরণকে ‘তথাকথিত নবজাগরণ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। সুপ্রকাশ রায়, সুমিত সরকার, অরবিন্দ পোদ্দার প্রমুখও এই অভিমত সমর্থন করেছেন। পণ্ডিত বিনয় ঘোষ নবজাগরণকে একটি ‘অতিকথা’ বা ‘myth’ বলে অভিহিত করেছেন।

(১.গ) নবজাগরণের স্রষ্টা—বাংলার নবজাগরণের প্রকৃত স্রষ্টা কারা তা নিয়ে পণ্ডিতদের মধ্যে বিতর্ক আছে। রমেশচন্দ্র মজুমদারের মতে, পাশ্চাত্য সভ্যতার সমন্বয়ে ভারতবাসীর অন্তরে নবজাগরণের সূচনা হয়।

(২) ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে সম্পর্ক বাংলার নবজাগরণের তুলনা

কোনো ঐতিহাসিক ইতালির এবং বাংলার নবজাগরণের মধ্যে সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য উভয়েই খুঁজে পেয়েছেন। কেউ আবার ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে বাংলার নবজাগরণের তুলনা অর্থহীন বলে মনে করেন।

(২.ক) সাদৃশ্য—পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের বিভিন্ন সাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। যেমন—[] ইতালির নবজাগরণ যেমন মধ্যযুগের কুসংস্কার, জড়তা ও অন্ধকার থেকে ইউরোপকে মুক্তির পথ দেখায়, বাংলার নবজাগরণ তেমনি মধ্যযুগের কুসংস্কার, জড়তা ও অন্ধকার থেকে ভারতকে মুক্তির পথ দেখায়। [] ইতালির নবজাগরণের অনুপ্রেরণার উৎস ছিল প্রাচীন গ্রিক ও লাতিন সাহিত্য। অনুরূপভাবে, বাংলার নবজাগরণের প্রেরণার উৎস ছিল প্রাচীন সংস্কৃত, মধ্যযুগীয় ফারসি এবং আধুনিক ইংরেজি সাহিত্য। [] ইতালির নবজাগরণে যে যুক্তিবাদী, মানবতাবাদী মানসিকতা লক্ষ করা যায়, তেমনি বাংলায় রামমোহন রায়, বিদ্যাসাগর প্রমুখের মধ্যে যুক্তিবাদী ও মানবতাবাদী মানসিকতার প্রতিফলন ঘটে। [] ইতালির নবজাগরণে যেমন কথ্যভাষায় সাহিত্যের প্রসার ঘটে, তেমনি বাংলার নবজাগরণেও বাংলা ভাষায় সাহিত্যের অগ্রগতি ঘটে।

(২.খ) বৈসাদৃশ্য—ইতালির নবজাগরণের সঙ্গে উনিশ শতকে বাংলার নবজাগরণের বিভিন্ন বৈসাদৃশ্য লক্ষ করা যায়। যেমন—–[] পঞ্চদশ-ষোড়শ শতকের ইতালির নবজাগরণ এবং উনিশ শতকের বাংলার নবজাগরণের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ইউরোপের বাণিজ্য বিপ্লব, নগর বিপ্লব প্রভৃতি ঘটনা ইতালির নবজাগরণের প্রেক্ষাপট রচনা করেছিল। কিন্তু বাংলার নবজাগরণে এরূপ প্রেক্ষাপট নেই। [] ইতালীয় নবজাগরণের মতো প্রবল গতিবেগ, উদ্যম বাংলার নবজাগরণে লক্ষ করা যায় না। [] ইতালির নবজাগরণ ছিল সার্বিক ও ব্যাপক। কিন্তু বাংলার নবজাগরণ ছিল সীমাবন্ধ’ নবজাগরণ। এই নবজাগরণ কেবল সমাজের উচ্চশ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। হিন্দুসমাজের বৃহত্তর নিম্নবর্ণের মানুষ, কৃষক সমাজ বা মুসলিম সমাজের সঙ্গে এই নবজাগরণের কোনো সম্পর্ক ছিল না।

(৩) সীমাবদ্ধতা

ঊনবিংশ শতকে বাংলার নবজাগরণে কিছু সীমাবদ্ধতা লক্ষ করা যায়, যেমন—(৩.ক) বাংলার নবজাগরণ মূলত সমাজের উচ্চশিক্ষিত ও উচ্চবিত্তদের মধ্যেই প্রসারিত হয়েছিল। শহুরে ইংরেজি শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণি এতে নেতৃত্ব দিয়েছিল। গ্রামের নিম্নস্তরের সাধারণ মানুষকে এই নবজাগরণ স্পর্শ করতে পারেনি। (৩.খ) বাংলার নবজাগরণ মূলত হিন্দুসমাজের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, এর সঙ্গে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিশেষ সম্পর্ক ছিল না। (৩.গ) মূলত ব্রিটিশ সভ্যতা ও সংস্কৃতির ওপর নির্ভর করে বাংলায় জাগরণ এসেছিল।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা
error: সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত