[মান—৮] ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার সূচনা ও প্রসার আলোচনা করো।

[] ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্নে ভারতে পাঠশালা, টোল, মক্তব, মাদ্রাসা প্রভৃতি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভারতীয়রা আরবি, ফারসি ও সংস্কৃত ভাষার মাধ্যমে শিক্ষালাভ করত। ব্রিটিশ শাসকরাও প্রথম দিকে এদেশে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে বিশেষ আগ্রহ দেখায়নি। এই সময়কালে ওয়ারেন হেস্টিংসের উদ্যোগে ‘কলিকাতা মাদ্রাসা’, উইলিয়াম জোনস্-এর উদ্যোগে ‘কলিকাতা এশিয়াটিক সোসাইটি’ (১৭৮৪ খ্রি.) এবং জোনাথান ডানকানের উদ্যোগে বারাণসীতে সংস্কৃত কলেজ (১৭৯১/৯২ খ্রি.) প্রভৃতি প্রাচ্যবাদী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপিত করেন। লর্ড ওয়েলেসলি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ‘ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ’ প্রতিষ্ঠা করেন। অবশ্য পরে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসারে বিভিন্ন উদ্যোগ লক্ষ করা গিয়েছিল, যেমন—

(১) মিশনারিদের উদ্যোগ = ‘

শ্রীরামপুর ত্রয়ী’ নামে খ্যাত  মার্শম্যান, ওয়ার্ড ও উইলিয়াম কেরি ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। এই মিশন ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দে শ্রীরামপুরে একটি কলেজ প্রতিষ্ঠা করে। স্কটিশ মিশনারি আলেকজান্ডার ডাফ-এর উদ্যোগে ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে ‘জেনারেল অ্যাসেম্বলিজ ইনস্টিটিউশন’ (বর্তমান স্কটিশ চার্চ কলেজ) গড়ে তোলেন। এছাড়া প্রতিষ্ঠিত হয় ‘সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ’, ‘লরেটো হাউজ কলেজ’ প্রভৃতি।

(২) অন্যান্যদের উদ্যোগ =

কয়েকজন মুক্তমনা ভারতীয় এবং কয়েকজন বিদেশি এদেশে ইংরেজি ও আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষাদানের উদ্দেশ্যে কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। রামমোহন রায় ১৮১৫ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় ‘অ্যাংলো-হিন্দু স্কুল’ প্রতিষ্ঠা করেন। ডেভিড হেয়ার, রাধাকান্ত দেব, বৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়, স্যার এডওয়ার্ড হাইড ইস্ট প্রমুখের প্রচেষ্টায় এবং রামমোহন রায়ের উৎসাহে কলকাতায় ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে হিন্দু কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটি ১৮৫৫ খ্রিস্টাব্দে প্রেসিডেন্সি কলেজ নামে পরিচিত হয়। ডেভিড হেয়ার ১৮১৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় পটলডাঙা একাডেমি (বর্তমানে হেয়ার স্কুল) নামে একটি ইংরেজি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। এ ছাড়া হেয়ারের উদ্যোগে ‘কলকাতা স্কুল বুক সোসাইটি” (১৮১৭ খ্রি.) এবং ‘কলকাতা স্কুল সোসাইটি’ (১৮১৮ খ্রি.) প্রতিষ্ঠিত হয়।

(৩) প্রাচ্যবাদী ও পাশ্চাত্যবাদী =

বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্কের (১৮২৮-৩৫ খ্রি.) আমলে টমাস মেকলে ‘কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন’-এর সভাপতি নিযুক্ত হন। এই সময় ভারতে প্রাচ্য না পাশ্চাত্য রীতিতে সরকারের শিক্ষাদান করা উচিত—এবিষয়ের আলোচনায় উক্ত কমিটির সদস্যরা দুটি দলে বিভক্ত হয়ে পড়ে। যথা—প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট এবং পাশ্চাত্যবাদী বা অ্যাংলিসিস্ট। যাঁরা প্রাচ্য রীতিতে ভারতে শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন, যেমন—এইচ. টি. প্রিন্সেপ, কোলব্রুক ও উইলসন, তাঁরা প্রাচ্যবাদী নামে পরিচিত হন। আর যাঁরা পাশ্চাত্য রীতিতে ভারতে শিক্ষাদানের পক্ষপাতী ছিলেন, যেমন—আলেকজান্ডার ডাফ, মেকলে, সন্ডার্স, কলভিন প্রমুখ, তারা পাশ্চাত্যবাদী নামে পরিচিত হন।

(৪) মেকলের ‘মিনিট’ =

মেকলে ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে তাঁর বিখ্যাত ‘মিনিট’ বা প্রস্তাব লর্ড বেন্টিঙ্কের কাছে পেশ করে সরাসরি পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষে অভিমত দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল– প্রাচ্যের শিক্ষায় কোনো বৈজ্ঞানিক চেতনা নেই এবং তা পাশ্চাত্য শিক্ষার চেয়ে সম্পূর্ণ নিকৃষ্ট। মেকলে ‘চুঁইয়ে পড়া নীতি’তে বিশ্বাসী ছিলেন।

(৫) বেন্টিঙ্কের উদ্যোগ =

লর্ড বেন্টিঙ্ক ইংরেজি শিক্ষা সরকারের নীতি হিসেবে ঘোষণা করেন ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে। তাঁর উদ্যোগের ফলে মেডিকেল কলেজ (১৮৩৫ খ্রি.), সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ, বোম্বাই-এ এলফিনস্টোন ইনস্টিটিউশন (১৮৩৫ খ্রি.) প্রভৃতি স্থাপিত হয়।

(৬) উডের ডেসপ্যাচ = ‘

বোর্ড অব কন্ট্রোলে’র সভাপতি চার্লস উড ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দে শিক্ষা-সংক্রান্ত এক নির্দেশনামা প্রকাশ করে যা ‘উডের ডেসপ্যাচ’ নামে পরিচিত। একে ভারতে পাশ্চাত্য শিক্ষাবিস্তারের ‘ম্যাগনা কার্টা’ বা ‘মহাসনদ’ বলা হয়। মূলত এই নির্দেশনামা অনুসারে আধুনিক ভারতের শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এই নির্দেশনামায় দেশের বিভিন্ন স্থানে আরও প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুল এবং কলেজ প্রতিষ্ঠা, কলকাতা, বোম্বাই ও মাদ্রাজে তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, নারীশিক্ষার প্রসার প্রভৃতির কথা বলা হয়। [] মূল্যায়ন = মধ্যবিত্তদের মধ্যে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী পাশ্চাত্য ও উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত হলেও সেই হারে সরকারি চাকরি বৃদ্ধি পায়নি। পশ্চিম ও দক্ষিণ ভারতের উচ্চশিক্ষিতরা শিল্প, বাণিজ্য এবং দেশীয় রাজাদের কাজে নিযুক্ত হলেও পূর্ব ভারতে সে সুযোগ ছিল খুব কম। তাছাড়া মধ্যবিত্তদের মধ্যে উচ্চশিক্ষার বিপুল চাহিদা থাকায় বেসরকারি উদ্যোগে সারা ভারতে বিভিন্ন উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে থাকে।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা
error: সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত