ভারতীয় অর্থনীতিতে রেলপথ নির্মাণের প্রভাব লেখ।

[] ভারতে রেলপথের প্রবর্তন ভারতীয় জনজীবন, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের সূচনা করে। ঔপনিবেশিক অর্থনীতিতে রেলপথ নির্মাণের গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রভাব লক্ষ করা যায়। এই প্রভাব সদর্থক ও নঞর্থক উভয় ধরনেরই ছিল।

।। সদর্থক প্রভাব ।।

পরিবহণ বৃদ্ধি = পূর্বে ভারতে পশুচালিত গাড়ি, নৌকা প্রভৃতি ছিল দেশের প্রধান পরিবহণ মাধ্যম। রেল ব্যবস্থার প্রসারের ফলে ভারতে মানুষ ও পণ্য উভয় পরিবহণের কাজে রেল যোগাযোগের ব্যবহার ব্যাপক বাড়ে।

আন্তর্জাতিক বাজার = রেলপথের প্রসারের ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে ভারতীয় কৃষিপণ্যের প্রবেশ ঘটে।

অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধি = রেলপথের মাধ্যমে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারগুলির মধ্যে যোগাযোগ স্থাপিত হয় এবং এক অঞ্চলের পণ্য অন্য অঞ্চলে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য বৃদ্ধি পায়।

রপ্তানি ও আমদানি বৃদ্ধি = রেলের মাধ্যমে স্বল্পব্যয়ে মালপত্র পরিবহণ করা সম্ভব হত। তাই গম, চাল, চা, পাট, চামড়া, তৈলবীজ, তুলো প্রভৃতি কাঁচামাল রেলের মাধ্যমে সহজে বন্দরে নিয়ে যাওয়া যেত। তেমনি ভারতে বিদেশি পণ্যের আমদানি যথেষ্ট বৃদ্ধি পেয়েছিল। রেল যোগাযোগের ফলে আমদানি বৃদ্ধি পায় প্রায় ৩ গুণ।

কর্মসংস্থান = ভারতে রেলপথের প্রসার শুরু হলে রেলপথ নির্মাণ, রেলকারখানা প্রভৃতির ক্ষেত্রে বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়। দেশের ভূমিহীন কৃষকরা অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে রেলের কাজে নিযুক্ত হয়।

।। নঞর্থক প্রভাব ।।

ভারতে রেলপথের প্রসারের বেশ কিছু নঞর্থক প্রভাবও লক্ষ করা যায়।

সম্পদের বহির্গমন = রেলপথ নির্মাণের জন্য গ্যারান্টিপ্রথার মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ বিদেশি মূলধন বিনিয়োগ করা হয়। এর ফলে সুদ ও মুনাফা হিসেবে প্রচুর পরিমাণ অর্থ প্রতি বছর ইংল্যান্ডে চলে যেতে থাকে।

ভারীশিল্পের প্রসার না ঘটা = রেলের ইঞ্জিন ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিগুলি ইংল্যান্ড থেকে ভারতে আমদানি করে এদেশে রেলপথ নির্মিত হয়। ফলে ভারতে রেলপথ নির্মিত হলেও এদেশে ভারীশিল্পের বিশেষ প্রসার ঘটেনি।

কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বৈষম্য = রেলপথের প্রসারের ফলে সরকারি উচ্চপদে প্রচুর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এসব পদে শ্বেতাঙ্গদেরই নিযুক্ত করা হত।

জলপথ ও সেচের ক্ষতি = দেশের বিস্তীর্ণ অংশে রেলপথ এবং নদীনালার ওপর রেলের সেতু নির্মিত হলে নদীনালায় পলি সঞ্চিত হয়ে জলস্রোত কমে আসে এবং নদীর পরিবহণযোগ্যতা হ্রাস পায়। ফলে জলপথে পরিবহণ এবং কৃষিজমিতে সেচের কাজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দেশীয় শিল্প বাণিজ্যের সর্বনাশ = রেলের মাধ্যমে ভারতের দুরদূরান্তের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিলাতি পণ্যসামগ্রী ছড়িয়ে পড়ে। ফলে দেশীয় পণ্যগুলি অসম প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয় এবং দেশীয় শিল্প-বাণিজ্য মার খায়।

উপসংহার = ব্রিটিশ সরকার নিজেদের স্বার্থেই ভারতে রেলপথের প্রতিষ্ঠা করে। তবে রেলপথের প্রসারের ফলে ভারতীয়রা উপকৃতই হয়। ভারতের কৃষি ও শিল্পের বিকাশ রেলের মাধ্যমেই সম্ভব হয়। ভারতবর্ষ স্বাধীনতা লাভের পর এই রেলের মাধ্যমেই শিল্পায়নের পথে অগ্রসর হয়।

উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের শুভেচ্ছা
error: সর্বস্বত্ত্ব সংরক্ষিত